সঞ্চয় ফুরোচ্ছে, নিচে নামছে মধ্যবিত্ত

আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ১১-১০-২০২৬
গাইবান্ধা শহরের পুরাতন বাজারে সকালে ক্রেতার অভাব নেই। কিন্তু ভিড়ের বড়ো অংশ কিনছেন না, শুধু দাম জেনে এগিয়ে যাচ্ছেন। কেউ সবজির ঝুড়ি থেকে আধা কেজি তুলে আবার নামিয়ে রাখছেন। কেউ ডিমের দাম শুনে ডালের দোকানের দিকে হাঁটছেন। এই দৃশ্য একদিনের নয়। মাসের পর মাস ধরে শহরের ঘরে ঘরে এক হিসাব জমছে, যা আর মিলছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত খাতে তা ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের খরচই এখন বেশি ভোগাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ, আর মানুষের আয় বেড়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। আয় যতটা বেড়েছে, খরচ বেড়েছে তার চেয়ে বেশি। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ায় পরিবহন থেকে রান্নাঘর, সবখানে তার প্রভাব পড়েছে।
গাইবান্ধার মানুষ এসব পরিসংখ্যান মুখস্থ রাখেন না। তারা জানেন, মাসের শেষে পকেটে কী থাকে।
শহরের পৌর এলাকায় রিকশা চালান সাহারুল ইসলাম (৪৫)। দিনে আয় গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। পাঁচ বছর আগে এই আয়ে স্ত্রী ও তিন সন্তানের সংসার ভালোই চলত। এখন ঘরভাড়া, চাল ও সবজির দাম আর সন্তানদের পড়ার খরচ মিলিয়ে হিসাব মেলে না।
সংসার টানতে তার স্ত্রী এখন আশপাশের বাড়িতে কাজ করেন। ছোট ছেলে স্কুলের ফাঁকে দোকানে ফরমায়েশ খাটে। পরিবারের মোট আয় আগের চেয়ে বেড়েছে, তবু সাহারুলের কথায়, ‘আয় বাড়ছে, কিন্তু শান্তি বাড়ছে না। সবজির দোকানে যেতেই এখন ভয় লাগে।’
শুধু দিনমজুর বা রিকশাচালক নন, নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীরাও একই চাপে। শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সাজ্জাদ মাহমুদ (৩৮)। বেতন কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু মাসের ২০ তারিখের পর থেকেই ধারের চিন্তা শুরু হয়।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শারমিন শাম্মী (৪২) বলেন, ‘বাসাভাড়া আর গাড়িভাড়া হুট করে বাড়ানো যায়, বেতন তো ইচ্ছেমতো বাড়ে না। শখ-আহ্লাদ দূরে থাক, টিকে থাকাই এখন কঠিন।’
একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের হিসাব ছিল সহজ। বাড়ি ভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়া, মাস শেষে সামান্য সঞ্চয়। এখন সেই শেষ ধাপটাই সবার আগে হারিয়েছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অবলম্বনের নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তাঁর ভাষায়, ‘যাদের আয় কাগজে-কলমে বেড়েছে, তাঁরাও বাস্তবে আরও দরিদ্র হয়েছেন।’
পরিবারগুলোর এখনো কোনো সঞ্চয় আছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর দিন দিন ‘না’ হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অনেকে জমানো টাকা তুলে ফেলছেন, অপ্রয়োজনীয় খরচ কাটছেন, সস্তা পণ্য কিনছেন, এমনকি স্বাস্থ্য ও শিক্ষার খরচেও হাত দিচ্ছেন।
গাইবান্ধার পাড়া-মহল্লার প্রায় ঘরেই এই চেহারা চেনা। মাছ-মাংস আসে কালেভদ্রে, ডিম-ডাল-সবজিই ভরসা। ছোটোখাটো অসুখে ডাক্তারের বদলে ওষুধের দোকান। বাইরে খাওয়া বা পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া তালিকা থেকে বাদ। কেউ সন্তানকে নামি স্কুল থেকে সরিয়ে কম খরচের স্কুলে ভর্তি করছেন। কেউ আত্মীয়ের কাছে হাত পাতছেন, কেউ ঋণ করছেন।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই চাপে সবচেয়ে বিপাকে মধ্যবিত্ত। ধনীদের প্রশ্ন, ‘কিনতে পারব কি না।’ হতদরিদ্রদের জন্য আছে সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। কিন্তু মধ্যবিত্তের প্রশ্ন, ‘সঞ্চয়ে হাত না দিয়ে, অন্য খরচ না কমিয়ে কীভাবে কিনব?’ তাঁরা সহায়তার যোগ্য নন, আবার ধাক্কা সামলানোর সামর্থ্যও নেই।
তার ওপর আছে সামাজিক মর্যাদার চাপ। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে সংকটের কথা বলতে পারেন না, টিসিবির ট্রাকের লাইনে দাঁড়াতেও দ্বিধা করেন। কষ্টটা তাই থেকে যায় ঘরের ভেতরেই।
লেখক-গবেষক জহুরুল কাইয়ুম বলছেন, অর্থনৈতিক চাপে মানুষের সামাজিক অবস্থান স্থায়ীভাবে নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ আজ যিনি মধ্যবিত্ত, কয়েক বছর পর তিনি নিম্নবিত্তের কাতারে নেমে যেতে পারেন।
এই চাপ কেবল পারিবারিক বাজেটে আটকে নেই। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, উৎপাদন খরচ বাড়া ও ক্রেতার চাহিদা কমার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। কারখানা উৎপাদন কমাচ্ছে, নতুন কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ হচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্প্রতি এক গবেষণা বলছে, এই সংকটের স্থায়িত্বই একে বিপজ্জনক করেছে। দরিদ্র পরিবারের বাজেটের বড়ো অংশ যায় খাবারে, প্রকৃত আয় কমায় তাদের খরচ কাটার আর জায়গা নেই।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এ সংকট সামাল দেওয়া যাবে না। সরবরাহে বাধা, বাজারের অব্যবস্থাপনা ও বিতরণ কাঠামোর ত্রুটিই মূল কারণ। এ সময়ে মানুষের চাহিদা চেপে ধরতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
গাইবান্ধার বাজারে দাঁড়িয়ে এসব তত্ত্ব অনেকের কাছেই দূরের কথা। তাঁদের প্রশ্ন সোজা- মাস শেষে ঘরে চাল থাকবে তো? সন্তানের স্কুলের ফি দিতে পারব তো?
বাজার তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি আর সীমিত আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা ছাড়া এই চাপ কমার লক্ষণ নেই। ততদিন গাইবান্ধার ঘরে ঘরে হিসাব মেলানোর নীরব লড়াই চলবেই।
গাইবান্ধা উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলা। এখানকার অর্থনীতির বড়ো অংশ ধান, পাট, ভুট্টা, সবজি ও চরাঞ্চলের ফসলের ওপর দাঁড়িয়ে। তবু এই জেলার মানুষও বাজারের আগুনে পুড়ছেন। কারণ, মূল্যস্ফীতির চাপ কেবল শহরের ভোক্তার সমস্যা নয়, এটি মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলের সমস্যা।
কৃষক সেচের ডিজেল, বিদ্যুৎ, সার ও পরিবহনে বাড়তি খরচ গুনছেন, অথচ ফসলের দাম নিয়ে সব সময় নিশ্চয়তা পান না। আবার সেই কৃষকই যখন বাজারে যান, তখন চাল, তেল, ডাল, মাছ বা ওষুধ কিনতে গিয়ে উচ্চ দামের মুখোমুখি হন। উৎপাদক ও ভোক্তা, দুই ভূমিকাতেই চাপ। আর স্থানীয় অর্থনীতির ওপর ভর করা ছোট ব্যবসায়ী, শিক্ষক, বেসরকারি চাকরিজীবী ও দোকানির আয়ও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে মানুষের হাতে নগদ টাকা থাকার ওপর। সেই টাকা কমলে বাজারে বেচাকেনা কমে, আয়ের পথ আরও সংকুচিত হয়।
নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা চরাঞ্চলের মানুষের জন্য এই চাপ আরও নির্মম। সেখানে একটা দুর্যোগই বছরের সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে। জীবনযাপনের ব্যয় বাড়লে সেই ঝুঁকি সামলানোর সক্ষমতা আরও কমে যায়।
অর্থনীতিবিদেরা যে ‘নিম্নগামী গতিশীলতা’র কথা বলছেন, গাইবান্ধার মতো জেলায় তার মানে আরও গভীর। এখানে মধ্যবিত্তের পেছনে বড়ো কোনো আর্থিক নিরাপত্তা জাল নেই। সঞ্চয় ফুরোলে ভরসা হয় ঋণ, আর ঋণ শোধ করতে গিয়ে সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। তাতে একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকার সামাজিক ভিত দুর্বল হয়।
তাই সমাধানও হতে হবে স্থানীয় বাস্তবতা মেনে। কৃষি উপকরণের দাম ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য কার্যকর সহায়তা চালু করা জরুরি। না হলে গাইবান্ধার মাঠে ফসল ফললেও ঘরে স্বস্তি ফিরবে না।
গাইবান্ধার বাজারে সন্ধ্যা নামলে দোকানিরা বাতি জ্বালান, ক্রেতারা থলে হাতে ফেরেন। অনেকের থলে আজ আগের চেয়ে হালকা। সেই হালকা থলেই এখন এই জেলার সবচেয়ে বড়ো সত্য।

সম্পাদকীয় :

Editor: Mostafizur Rahman (মোস্তাফিজুর রহমান).

Published by: Bangla Biggapon USA Inc. 4315. 12  AVE # D-4 Brooklyn NY- 11219.

Email: dailyjugandhar@gmail.com. Call: 929-462-3348. Tell: +17188533605

অফিস :