‘২ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ অযৌক্তিক’

আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ১১-১০-২০২৬
২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ (কেন্দ্র ভাড়া) পরিশোধকে অযৌক্তিক বলেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। বর্তমান বিদ্যুৎ-সংকটের জন্য ভুল নীতি, সিদ্ধান্তহীনতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে মূল কারণ উল্লেখ করেছে মন্ত্রণালয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত নথিতে এসব উল্লেখ করা হয়। জাতীয় সংসদ ভবনে গতকাল শনিবার এই বৈঠক হয়। নথিতে সংকটের জন্য অযৌক্তিক ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে পরিকল্পনার অভাবকেও দায়ী করা হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় তিন ধাপের পরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়।
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনায় বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতের চলমান সংকটের কারণ ভুল নীতি, সিদ্ধান্তহীনতা ও পরিকল্পনার অভাব। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধকে অযৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরা হয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নে পরিকল্পনার অভাবকেও সংকটের কারণ বলা হয়। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নথিতে উল্লেখ করা হয়নি।
বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর এমপি মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ-সংকটের পেছনে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও পরিকল্পনাহীনতার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের বিপুল ব্যয়ের কথাও উঠে এসেছে। ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়ে হাইকোর্টে একটি মামলার রায় হয়েছে। পরে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। ওই কমিটির সুপারিশ কী ছিল এবং তা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, সে বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে জানাতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে সংকট মোকাবিলায় তিন ধাপের পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। প্রথম ধাপে জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা, শুল্ক কমানো, ক্যাপাসিটি চার্জ ও সংশ্লিষ্ট চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং জরুরি বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এ ধাপের সময়সীমা আগামী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় বেজলোড বিদ্যুৎকেন্দ্রের আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের বিষয় রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র মডুলার রিঅ্যাক্টর এবং আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ আমদানির কথা বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ এবং গণশুনানি ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন কমিটির এক সদস্য।
নাজিবুর রহমান বলেন, ২০০৩ সালের বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইনের ৩৪ ধারায় বলা আছে, কমিশন শুনানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করবে। এ জন্য তারা একটি প্রবিধান তৈরি করবে। গত ২৩ বছরে কেন এই প্রবিধান তৈরি করা হয়নি, তা তাঁরা বৈঠকে জানতে চেয়েছেন। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেনি। সম্প্রতি এলপিজি ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গণশুনানি করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতি কতটুকু, সে বিষয়েও বৈঠকে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি মন্ত্রণালয়।
কমিটির আরেক সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) হাসনাত আবদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ডিজেলের মজুত আছে মাত্র ৩১ দিনের। কীভাবে এই মজুত বাড়ানো যায়, তা দেখতে বলা হয়েছে। বর্তমানে ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে, কিন্তু উৎপাদিত হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। তাঁরা এ বিষয়ে ফরেনসিক অডিট করতে বলেছেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, রান্নার ১২ কেজি এলপিজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাজারে সরকার অনুপস্থিত, কোনো নজরদারি নেই। তাঁরা সরকারের নজরদারি বাড়ানোর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ৫০ মেগাওয়াটের একটি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারের প্রকল্পে ব্যয় ৩৫০ কোটি টাকার বেশি ধরা হয়েছে। তাঁরা মন্ত্রণালয়কে আগামী বৈঠকে এ ধরনের প্রকল্পে কোন খাতে কত খরচ ধরা হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব দিতে বলেছেন।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে আসেননি বলেও অভিযোগ করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন কার্যকর সংসদীয় স্থায়ী কমিটি না থাকায় প্রশাসনের একাংশের মধ্যে এসব কমিটিকে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই কমিটিগুলো চা-শিঙাড়া কমিটি না হয়ে যেন ফাংশনাল কমিটি হয়।
বৈঠকের বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে প্রকৃত উৎপাদন ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট, প্রকৃত উৎপাদন আড়াই থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল থেকে কতটুকু বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, তা পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
কমিটির সভাপতি মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, রফিকুল ইসলাম হিলালী, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মমতাজ আলো, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ)।

সম্পাদকীয় :

Editor: Mostafizur Rahman (মোস্তাফিজুর রহমান).

Published by: Bangla Biggapon USA Inc. 4315. 12  AVE # D-4 Brooklyn NY- 11219.

Email: dailyjugandhar@gmail.com. Call: 929-462-3348. Tell: +17188533605

অফিস :